হেফাজত, শাপলা ও স্বীকৃতি

রুকন  ইনআম লোবান


হেফাজত ইসলাম। পরিচয় করিয়ে দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। তবু, আলোচনার সুবিধার্থে হেফাজতের সম্যক পরিচয় আসতে পারে। হেফাজত, ইসলাম_ দুটিই আরবি শব্দ। হেফাজত মানে সংরক্ষণ, ইসলাম মানে আম্বিয়া কিরাম আলাইহিমুস সালাম আনীত দ্বীন তথা আসমানী জীবননীতি। হেফাজতে ইসলাম এক দশক কাছাকাছি আগে জন্মলাভ করে। ইসলাম বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরপত্র তৈরি করা, যুগের মুশকিলাতের ইসলামের বিশ্লেষণ ও অপপ্রচারের প্রতিরোধের নিমিত্তে হেফাজত সৃষ্টি হয়। এখন, হেফাজত নিজের পরিচয় মহাদেশ ও মহাকাশেও সমুজ্জ্বল করেছে। আমি আশা করি, হেফাজত আসমান ও আরশেও মকবুল হয়েছে।
বাংলাদেশের বৃহত্তম অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন হেফাজত ইসলাম। সকল ইসলাম-মনা ও ইসলাম-মানা লোকের আদর্শের বাতিঘর হেফাজত। এই সর্বপ্লাবি গ্রহণযোগ্যতার পেছনে হেফাজতের ইখলাস, চিন্তন, রক্ত, ঘাম ও ইশকের নজরানা ছিল। সেসব দাস্তান আপনারা জানেন।

হেফাজতের জন্মের সময় সর্বপ্রিয় ও অজেয় সংগঠন ছিল না। হাটহাজারীর বড় হুজুর কেন্দ্রীভূত একটা আত্মশুদ্ধির মাহফিল ছিল হেফাজত। যাঁদের কর্মসূচি আত্মা ও সত্তার শোধণ ও পরিশুদ্ধিই ছিল মৌলিক। সামাজিক বা রাষ্ট্রিক চৈতন্য সেখানে সুতীব্র সক্রিয় ছিল না। শাহবাগের উত্থান ও শাহবাগের তলদেশ দিয়ে নাস্তিকতার নামে ইসলাম বিরোধী বিষাক্ত অপপরিকল্পনা যখন সমস্ত শুভবোধ ও শোভন বোধিকে আক্রান্ত করছিল। তখন হেফাজত পুরো মুসলিম উম্মাতের গণসমর্থণ নিয়ে শাহবাগের প্রতিরোধে ঈমানী জোয়ারে স্ফীত হল। প্রকৃত তত্ত্ব হল, তখনই হেফাজতের তারুণ্য শুরু হয়। হেফাজতের প্রভা ও প্রভাব তরুণ অরুণের মতো সমৃদ্ধ হয়ে আসে।


হেফাজতের সফরে সফলতা বেশি, টুকটাক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা ছিলই। হেফাজত শাহবাগের নগ্ন আস্ফালনকে থামিয়ে দিয়েছে। একটা আট বছর বয়সী সংগঠনের জন্যে এটা সন্তুষ্টির উপকরণ হতে পারে। হেফাজতের সেরা অর্জন ও সোনালি সফলতা কী?
শাপলার বুকে, শাপলার মুখে, শাপলার ডালে ও শাপলার গালে ঈমানী প্রতিবাদই হেফাজতের সেরা ও শ্রেয় সোনালু ফুল। শাপলার রাতে হেফাজতের ভূমিকা, পরিকল্পনা ও পরিণতি নিয়ে আমি এখানে বহস করছি না।
শুধু এটুকু বলতে পারি, লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষের মোনাজাত, আহাজারি, রোনাজারি ও রক্তস্রোত আল্লাহর দরবারে মকবুল না হয়ে পারে না। আলহামদুলিল্লাহ তা কবুলও হয়েছে। শাপলার প্রান্তরে লক্ষ লোক ক্ষমতার পালাবদলের জন্যে জমায়েত হননি। শাপলা নাস্তিকতার আখড়ার বিরুদ্ধে ছিল, সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। শাপলা শাহবাগের বিপক্ষে ছিল, রাষ্ট্রের বিপক্ষে ছিল না।
শাপলাকে যারা ক্ষমতার দোলনা বানাতে চেয়েছে, তারা হতাশ হলেও মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ আলাইহিস সালামের আশিকরা আশাহত হননি। ইসলামের দিওয়ানাগণ রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, শহীদ হয়ে, পঙ্গু হয়ে ও ছিন্নভিন্ন হয়ে ইসলামের বৈজয়ন্তী উড়িয়েছেন। শাপলায় তৌহিদী জনতা বিপর্যস্ত হয়েছে ঠিকই, বিধ্বস্ত হয়নি।
খেয়াল করেছেন? শাপলার পাপড়ি যারা ছিঁড়েছে, তারাই শাপলার মৃণালে প্রার্থনা ও আরাধনা করছে।
যারা শাপলার মালিকে নিন্দাবাদ করত, তারা শাপলার বাগানে মৌমাছির মতো ঘুরঘুর করছে। এটা হেফাজতের মধুর প্রতিশোধ বা জালিমের শুভ বোধোদয়।


শাপলার হেফাজত গাজি, শহীদ, মকবুল ও শক্তিশালী। কারণ, শাপলার প্রাঙ্গণে প্রিয় নবীজীর শানের পতাকা উচ্চকিত করতে মুমিনরা শাপলায় জড়ো হয়েছেন। শানে রেসালতের প্রয়োজনে রক্তের কুরবানী হয়েছে। শাহাদাতের পিয়ালা ঠোঁটে ধরেছিলাম ইসলামের হেফাজতের শপথ নিয়ে। জীবন, শরীর ও সম্ভবনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে মহান আল্লাহর রিযা চেয়েছি।
এই কারণে হেফাজতের শাপলা ট্রাজেডি বা শাপলার হেফাজত অভিযাত্রা আল্লাহর সকাশে কবুল। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাছেও মকবুল।

হেফাজতের মূল কাজ ইসলামের মর্যাদা সংরক্ষণ। কওমি মাদরাসার বিশয়আশয় হেফাজতের মূল বিষয় নয়। যদিও হেফাজতের সমূল নেতৃত্ব কওমি আলিমদের নিয়ন্ত্রণে। হেফাজতের সমর্থন সর্বমতের মানুষের মাঝে আছে। কিন্তু হেফাজতের জন্ম, সফর ও সাংগঠনিক কাঠামো কওমি ওলামাময়।

কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ছিল না। এটা একটা রাষ্ট্রের জন্যে লজ্জাজনক। বিপুল শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অস্বীকৃতি রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা, আর্থিক অগ্রগতি ও কল্যাণ ভাবনার পরিপন্থী। স্বীকৃতির আন্দোলন করে আসছে কওমি বোর্ডসমূহ।
হেফাজতের আমীর ও কওমি বোর্ডের শীর্ষ মুরুব্বি এক হওয়ায় স্বীকৃতির পথ সরল হয়েছে।
আওয়ামীলীগ সরকার, বিশেষত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদরাসাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। এজন্য আওয়ামীলীগ সরকার ও সরকার প্রধান অভিনন্দন ও দোয়া পেতে পারেন। কৃতজ্ঞতা ঈমানের ভূষণ। তবে, লক্ষ্য রাখতে হবে, কৃতজ্ঞতার কলেবর যেন দালালি বা দলাদলিতে পর্যবসিত না হয়।

স্বীকৃতি কওমি ঘরানার মূল প্রতিষ্ঠান দেওবন্দের আদলে হয়েছে। এবং কওমি মাদরাসা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বলবত থাকবে।
এটা খুব খারাপ হয়েছে, চক্ষুষ্মান কেউ এরকম বলবে না। ( স্বীকৃতি নিয়ে আলাদা লিখব। এখানে হেফাজতের সাথে স্বীকৃতির সংশ্লেষণ বিষয়ে আলাপ হচ্ছে। )
হেফাজতের সৌজন্যে স্বীকৃতি সহজ হয়েছে। স্বীকৃতি পেয়েছে কওমি মাদরাসা বোর্ডসমূহ। এই সত্য পরিষ্কার না থাকার কারণে অনেকে প্রমাদ গুনছেন।


হেফাজতকে স্বীকৃতি টোপ হিসেবে সরকার দিয়ে থাকতে পারে। কারণ, হেফাজতের সাথে কওমি মাদরাসার ওতপ্রোত সম্পর্ক বিদ্যমান। হেফাজতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি সম্পর্কে সরকারের উচ্চমহল ওয়াকিবহাল। সরকার হেফাজতের সাথে শাপলার রাতে যা করেছে, তার বিস্ফোরিত ও বিস্ফারিত আবেগজাত প্রতিক্রিয়া বিষয়ে সরকারে উদ্বেগ ছিল। এটা প্রশমনে সরকারের উদ্যোগ ও কর্মসূচি ছিল। তার একটি স্বীকৃতি হতেই পারে।
এটা সরকারের টোপ হলেও কওমিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার। এটা নিতে আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে, হেফাজত যেন স্বীকৃতির আহ্লাদে বাগবাগ খুশি না হয়। উচ্ছ্বাসের উৎরোলে হেফাজতের মৌলিকতা যেন মিলিয়ে না যায়। স্বীকৃতি হেফাজতের মূল প্রসঙ্গ না হলেও অনুষঙ্গ অবশ্যই।

হেফাজত যদি শানে মুস্তফাকে স্বীকৃতির বিনিময় মনে করে, হেফাজত অতলে ডুবে যাবে। হেফাজতের সাথে শাপলায় যে নারকীয় আচরণ হয়েছে, তা যদি এখনকার মধুর সংযোগের কারণে ভুলে বসে, তাহলে, হেফাজত আত্মহত্যা করবে।
স্বীকৃতি জাতীয় ইস্যু। এটার দাবি যৌক্তিক ও প্রামাণ্য। এই দাবির জন্যে হেফাজত অতীত ভুলতে পারে না। এই দাবীর পরিণতিতে হেফাজত স্বকীয় লক্ষ্য উদ্দেশ্য হতে বিচ্যুত হলে, হেফাজত লাখ লাখ তৌহিদী জনতার কাছে গাদ্দার হয়ে যাবে। হেফাজত ঈমানিয়্যাতের প্রসঙ্গ ভুলে গেলে, উম্মত হেফাজতকে চোখের পলকে ভুলে যাবে।
শাপলার খুনীদের বিচার যদি হেফাজত না চায়, হেফাজতের বিচার আল্লাহ করবেন। শাপলার শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানী করলে, হেফাজত ইসলাম নষ্ট বেনিয়া হয়ে ইতিহাসের ধিক্কার পাবে।

আমরা হেফাজতকে তার মৌলিক দর্শন, কুরবানী, কর্মসূচি ও ইখলাসের সুবাদে ভালোবাসি।
কোন মৃত্যু-চক্ষু বা মায়ার মাখনের কাছে হেফাজত মাথানত করলে, আমরা অসহায় হয়ে যাব।
হেফাজত, শাপলার শহীদি কাফেলা, আমাদের আশাহত করবে না ইনশাআল্লাহ!

লেখক: কবি ও গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন