মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার

মাওলানা কাসেম শরীফ

ইসলাম একমাত্র জীবনব্যবস্থা, একমাত্র যার বিশ্ব সমাজ গড়ে তোলার মতো ঔদার্য আছে। এ ধর্ম মতে, আহলে কিতাব মুসলমান ও একই রাষ্ট্রে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মাঝে সামাজিকতার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য নেই। গোশত ছাড়া অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে আহলে কিতাব ও অন্যান্য কাফিরের মাঝে কোনো তারতম্য নেই। সবাই একে অন্যের খাবার বৈর্ধ পন্থায় গ্রহণ করতে পারবে। আর গোশতের ক্ষেত্রেও আহলে কিতাব ও মুসলমানদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। আহলে কিতাবের জবাইকৃত হালাম প্রাণী মুসলমানদের জন্য বৈধ।
ইসলাম শুধু অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতাই দেয়নি, তাদের সঙ্গে সামাজিক অংশীদারি, সৌজন্যবোধ ও মেলামেশার সুযোগ দিয়েছে। এমনকি আহলে কিতাবের রমণীদের বিবাহ করা বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ইসলাম যেহেতু পৃথক একটি ধর্ম। তাই আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠতার স্তর ও সহযোগিতার ধরনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে। ইসলাম অমুসলিমদের সব ক্ষেত্রে মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। তাদের যথাযথ সম্মান দিয়েছে।

অমুসলিমদের সঙ্গে ওঠাবসা

অমুসলিমদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে ইসলাম নিষেধ করে না। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা ও ওঠাবসা করা বৈধ। তবে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব স্থাপন করা যাবে না। এমনকি তাদের মসজিদে বসারও অনুমতি আছে।

عَنِ الْحَسَنِ، قَالَ: لَمَّا قَدِمَ وَفْدُ ثَقِيفٍ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم نَزَلُوا قُبَّةً كَانَتْ فِي مُؤَخَّرِ الْمَسْجِدِ، فَلَمَّا حَضَرَتِ الصَّلاَة، قَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: يَا رَسُولَ اللهِ، حَضَرَتِ الصَّلاَة وَهَؤُلاَءِ قَوْمٌ كُفَّارٌ وَهُمْ فِي الْمَسْجِدِ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: إنَّ
.الأَرْضَ لاَ تَنْجُسُ، أَوْ نَحْوَ هَذَا
অর্থ : হজরত হাসান বলেন, যখন সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধি রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির, তখন তারা মসজিদের শেষে গম্বুজের কাছে অবস্থান করে। যখন নামাজের সময় হলো, দলের একজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসুল! নামাজের সময় হয়েছে। এরা একদল অমুসলিম, তারা মসজিদে আছে। তখন রাসুল (সা.) বলেন, অমুসলিমদের কারণে জমিন নাপাক হয় না।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৮৫৭৬)

অমুসলিমদের প্রতি জুলুম করা নিষিদ্ধ

নবী করিম (সা.) কারো ওপর জুলুম করতে নিষেধ করেছেন, যদিও মজলুম অমুসলিম হয়।

قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، وَإِنْ كَانَ كَافِرًا، فَإِنَّهُ لَيْسَ
.دُونَهَا حِجَابٌ

অর্থ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থেকো, যদিও সে কাফের হয়। তার মাঝখানে আর আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা নেই (অর্থাৎ তার বদদোয়া দ্রুত কবুল হয়ে যায়)।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৫৭৭)

অমুসলিমদের সঙ্গে ভালো কথাবার্তা

অমুসলিমদের সঙ্গে শালীন কথাবার্তা বলতে হবে। আচার-আচরণে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে এসেছে :

قَالَ عَبْدُ اللهِ بنِ سَلامٍ: أَنَّ اللهَ لَمَا أَرَادَ هَدْيَ زَيْدِ بنِ سَعْيَةَ قَالَ زَيْدٌ لَمْ يَبْقَ شَئ مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ إِلَّا وَقَدْ عَرَفْتُهَا فِي وَجْهِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، حِينَ نَظَرْتُ إِلَيْهِ إِلَّا اثْنَتَيْنِ لَمْ أُخْبَرْهُمَا مِنْهُ: يَسْبِقُ حِلْمُهُ جَهْلَهُ، ولا يزيده شِدَّةُ الْجَهْلِ عَلَيْهِ إِلَّا حِلْمًا. قَالَ فَكُنْتُ أَتَلَطَّفُ لَهُ لِأَنْ أُخَالِطَهُ فَأَعْرِفَ حِلْمَهُ وَجَهْلَهُ، فَذَكَرَ قِصَّةَ إِسْلَافِهِ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وسلم مالاً في ثمرة، قَالَ فَلَمَّا حَلَّ الْأَجَلُ أَتَيْتُهُ فَأَخَذْتُ بِمَجَامِعِ قَمِيصِهِ وَرِدَائِهِ وَهُوَ فِي جِنَازَةٍ مَعَ أَصْحَابِهِ وَنَظَرْتُ إِلَيْهِ بِوَجْهٍ غَلِيظٍ، وَقُلْتُ: يَا مُحَمَّدُ أَلَا تَقْضِينِي حَقِّي؟ فَوَاللَّهِ مَا عَلِمْتُكُمْ بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَمُطْلٌ، قَالَ فَنَظَرَ إِلَيَّ عُمَرُ وَعَيْنَاهُ يَدُورَانِ فِي وَجْهِهِ كَالْفَلَكِ الْمُسْتَدِيرِ. ثُمَّ قَالَ يَا عَدُوَّ اللَّهِ أَتَقُولُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَسْمَعُ، وَتَفْعَلُ مَا أَرَى؟ فَوَالَّذِي بَعَثَهُ بِالْحَقِّ لَوْلَا مَا أحاذر لومه لَضَرَبْتُ بِسَيْفِي رَأْسَكَ، وَرَسُولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْظُرُ إِلَى عُمَرَ فِي سُكُونٍ وَتُؤَدَةٍ وَتَبَسُّمٍ…. ثُمَّ قَالَ: ” أَنَا وَهُوَ كُنَّا أَحْوَجَ إِلَى
.غَيْرِ هَذَا مِنْكَ يَا عُمَرُ، أَنْ تَأْمُرَنِي بِحُسْنِ الْأَدَاءِ

অর্থ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালমা (রা.) বলেন, যখন আল্লাহ তাআলা জায়েদ ইবনে সায়ইয়াকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিলেন, জায়েদ বলল, নবুওয়তের সব নিদর্শন আমি মহানবী (সা.)-এর চেহারায় অবলোকন করছি; কিন্তু দুটি নিদর্শন এখনো আমি অনুভব করতে পারিনি। এক. তাঁর ধৈর্য্য তাঁর অজ্ঞতার ওপর প্রাধান্য লাভ করবে। দুই. অজ্ঞতা তাঁর ধৈর্যকে আরো বাড়িয়ে দেবে। সাহাবি বলেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে মিশতে চেষ্টা করি, যাতে তাঁর ধৈর্য অনুভব করি। একবার আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে আসলাম। আমি তাঁর জামা ও চাদর ধরলাম। তিনি সঙ্গীদের সঙ্গে এক জানাজায় ছিলেন। আমি তাঁর দিকে রুক্ষ চেহারায় তাকালাম ও বললাম, হে মুহাম্মদ! তুমি কি আমার ঋণ আদায় করবে না? আল্লাহর কসম! তোমরা বনি মুত্তালিব টালবাহানার লোক। এ সময় ওমর (রা.) আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চেহারায় চক্ষু ঘোরাফেরা করছে ঘুরন্ত নক্ষত্রের মতো। ওমর (রা.) আমাকে বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন! তুমি কি রাসুলকে এমন কথা বলছ, যা আমি শুনছি? তুমি কি এমন কিছু করছ, যা আমি দেখছি? আল্লাহর কসম! মহানবী (সা.) আমাকে বকা না দিলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম। রাসুল (সা.) তখন ওমরের দিকে শান্ত, ভদ্র ও মুচকি হেসে তাকালেন। তারপর বললেন, হে ওমর! আমি ও সে এর চেয়ে উত্তম আচরণের মুখাপেক্ষী। তুমি আমাকে সুন্দরভাবে ঋণ আদায় করতে বলতে পারতে। আর তাকে সুন্দরভাবে ঋণ উসুল করার জন্য বলতে পারতে। হে ওমর! তুমি যাও ও তার হক আদায় করো এবং তাকে আরো অতিরিক্ত ২০ ‘সা’ ফল দাও।’ এটি দেখে জায়েদ ইবনে সায়ইয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং রাসুলের সঙ্গে বাকি সব যুদ্ধের ঘটনায় ছিলেন। তাবুক যুদ্ধের বছর তিনি ইন্তেকাল করেন।’ (ইবনে কাসীর, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ৩৮০)

অমুসলিম রোগীকে দেখতে যাওয়া সুন্নত

অমুসলিম রোগীকে দেখতে যাওয়াও সুন্নাত। নবী করিম (সা.) অমুসলিম রোগীদের দেখতে যেতেন ও তাদের ঈমানের দাওয়াত দিতেন। তাদের সেবা করতেন।

عَنْ أَنَسٍ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ كَانَ غُلاَمٌ يَهُودِيٌّ يَخْدُمُ النَّبِيَّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَرِضَ فَأَتَاهُ النَّبِيُّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعُودُهُ فَقَعَدَ عِنْدَ رَأْسِهِ فَقَالَ لَهُ أَسْلِمْ فَنَظَرَ إِلَى أَبِيهِ وَهْوَ عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُ أَطِعْ أَبَا الْقَاسِمِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَسْلَمَ فَخَرَجَ النَّبِيُّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
.وَهْوَ يَقُولُ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ

অর্থ : হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদি গোলাম নবী করিম (সা.)-এর খেদমত করত। যখন সে অসুস্থ হলো, তখন মহানবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন, তার মাথার দিকে বসলেন আর তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো! তখন সে তার পিতার দিকে দেখল। পিতা বললেন, তুমি আবুল কাসেমের অনুসরণ করো, ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (সা.) এই বলে বের হলেন, আল্লাহর শোকর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ১২৫৬)

এভাবে তিনি মৃত্যুর সময় তাদের দেখতে গিয়ে ইমানের দাওয়াত দিতেন ও জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।

অমুসলিম মৃতদের সম্মান করা সুন্নত

অমুসলিমদের জীবিতের যেমন হক রয়েছে, তেমনি মৃতদেরও হক রয়েছে। তাদের দাফনে সহযোগিতা করা ও মৃতদের সম্মান দেওয়া সুন্নত। কেননা তারা মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত।

عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ أَبِي لَيْلَى قَالَ كَانَ سَهْلُ بْنُ حُنَيْفٍ وَقَيْسُ بْنُ سَعْدٍ قَاعِدَيْنِ بِالْقَادِسِيَّةِ فَمَرُّوا عَلَيْهِمَا بِجَنَازَةٍ فَقَامَا فَقِيلَ لَهُمَا إِنَّهَا مِنْ أَهْلِ الأَرْضِ أَيْ مِنْ أَهْلِ الذِّمَّةِ فَقَالاَ إِنَّ النَّبِيَّ صَلّى
.اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّتْ بِهِ جَنَازَةٌ فَقَامَ فَقِيلَ لَهُ إِنَّهَا جَنَازَةُ يَهُودِيٍّ فَقَالَ أَلَيْسَتْ نَفْسًا

অর্থ : হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবি লায়লা থেকে বর্ণিত, সাহল ইবনে হুনাইফ ও কায়েস ইবনে সাদ কাদেসিয়াতে বসা ছিলেন। তখন তাদের পাশ দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে কিছু লোক অতিক্রম করল। তখন তারা দুজন দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন তাদের বলা হলো, ইনি তো কাফের। তখন তারা বলল, মহানবী (সা.)-এর পাশ দিয়ে একসময় এক জানাজা নেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁকে বলা হলো, এটা তো এক ইহুদির জানাজা। তখন তিনি বললেন, তা কি প্রাণী নয় (মানব নয়)?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২১৩)

অমুসলিমদের অন্যায়ভাবে হত্যা করা নিষিদ্ধ

যেসব অমুসলিম মুসলিম দেশে জিম্মি হিসেবে (মুসলিম রাষ্ট্রের আইন মেনে) বসবাস করে, তাদের হত্যা করা যাবে না। তেমনি যারা ভিসা নিয়ে আমাদের দেশে আসে, তাদের হত্যা করা যাবে না। তাদের জানমালের নিরাপত্তা মুসলমানদের মতোই অপরিহার্য। ইমাম বায়হাকি (রহ.) সুনানে কুবরা নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন,

عَنْ أَبِي الْجَنُوبِ الْأَسَدِيِّ، قَالَ: أُتِيَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ بِرَجُلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَتَلَ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الذِّمَّةِ، قَالَ: فَقَامَتْ عَلَيْهِ الْبَيِّنَةُ فَأَمَرَ بِقَتْلِهِ، فَجَاءَ أَخُوهُ فَقَالَ: إِنِّي قَدْ عَفَوْتُ، قَالَ: فَلَعَلَّهُمْ هَدَّدُوكَ وَفَرَقُوكُ وَفَزَعُوكَ، قَالَ: لَا، وَلَكِنْ قَتْلُهُ لَا يَرُدُّ عَلَيَّ أَخِي، وَعَوَّضُونِي فَرَضِيتُ. قَالَ: ” أَنْتَ أَعْلَمُ مَنْ كَانَ لَهُ ذِمَّتُنَا فَدَمُهُ كَدَمِنَا، وَدِيَتُهُ كَدِيَتِنَا

অর্থ : হজরত আবি জানুব আসাদি (রহ.) থেকে বর্ণিত, আলী (রা.)-এর দরবারে এক মুসলিমকে হাজির করা হয়, যে একজন অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করেছে। এ হত্যার প্রমাণও পাওয়া গেছে। তখন তিনি তাকে কেসাস হিসেবে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন মৃত ব্যক্তির ভাই এলো এবং বলল, আমি তাকে ক্ষমা করছি। তখন তিনি বললেন, হয়তো তার পরিবার তোমাকে ধমক দিয়েছে, ভীতি প্রদর্শন করেছে, হুমকি দিয়েছে। তখন সে বলল, না। কিন্তু তাকে হত্যা করলে আমার ভাই ফিরে আসবে না। আর তারা আমাকে ‘দিয়াত’ (রক্তপণ) দিয়েছে। তাই আমি রাজি হয়েছি। আলী (রা.) বললেন, ‘তুমি ভালো করেই জানো, যেসব অমুসলিম আমাদের রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে থাকবে, তাদের জীবন আমাদের মতো, তাদের রক্তপণ আমাদের মতো।’ (বায়হাকি, হাদিস : ১৫৯৩৪)
অন্য হাদিস শরিফে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ قَتَلَ
.مُعَاهَدًا لَمْ يَرَحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ وَإِنَّ رِيحَهَا تُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا

অর্থ : যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করে, সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না, অথচ তার সুগন্ধি ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১৬৬)

عن أَبِي بَكَرَةَ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا فِي غَيْرِ كُنْهِهِ
.حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ

অর্থ : হজরত আবু বাকারা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২০৬৪৮)

অমুসলিম বন্দীদের সঙ্গে সদাচার

কোনো কারণে যদি তাদের কোনো লোক বন্দী হিসেবে মুসলমানদের হাতে আসে, তখন তাদের বন্দীদের সঙ্গে সদাচার করতে হবে। তাদের আহার করানোর মধ্যেও সদকার সওয়াব রয়েছে। বরং যে কোনো প্রাণীকে আহার করাতে সদকা রয়েছে। কারণ প্রত্যেক প্রাণীর প্রাণ মর্যাদাবান। তাই তাদের অনর্থক নষ্ট করা নিষেধ।
কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত,

عَنْ قَتَادَةَ،قَوْلُهُ :(وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا) قَالَ : لَقَدْ أَمَرَ اللهُ
.بِالأَسْرَاءِ أَنْ يَحْسُنَ إِلَيْهِمْ، وَإِنَّ أَسْرَاهُمْ يَوْمَئِذٍ لِأَهْلِ الشِّرْكِ

অর্থ : ‌’তারা আহার করায় আল্লাহর মুহাব্বাতে মিসকিন এতিম ও বন্দীদের।’ এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বন্দীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করার জন্য বলেছেন। আর তখনকার বন্দীরা মুশরিকই ছিল।’ (তাফসিরে তাবারি : ২৪/৯৭)

বন্দীদের সঙ্গে ভালো আচরণের একটি দৃষ্টান্ত বুখারি শরীফে এভাবে এসেছে,

عن أَبي هُرَيْرَةَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم خَيْلاً قِبَلَ نَجْدٍ فَجَاءَتْ بِرَجُلٍ مِنْ بَنِيحَنِيفَةَ يُقَالُ لَهُ ثُمَامَةُ بْنُ أُثَالٍ فَرَبَطُوهُ بِسَارِيَةٍ مِنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ فَخَرَجَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ فَقَالَ عِنْدِي خَيْرٌ يَا مُحَمَّدُ إِنْ تَقْتُلْنِي تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ الْمَالَ فَسَلْ مِنْهُ مَا شِئْتَ حَتَّى كَانَ الْغَدُ ثُمَّ قَالَ لَهُ مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ قَالَ مَا قُلْتُ لَكَ إِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ فَتَرَكَهُ حَتَّى كَانَ بَعْدَ الْغَدِ فَقَالَ مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ فَقَالَ عِنْدِي مَا قُلْتُ لَكَ فَقَالَ أَطْلِقُوا ثُمَامَةَ فَانْطَلَقَ إِلَى نَخْلٍ قَرِيبٍ مِنَ الْمَسْجِدِ فَاغْتَسَلَ ثمَّ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ يَا مُحَمَّدُ وَاللَّهِ مَا كَانَ عَلَى الأَرْضِ وَجْهٌ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ وَجْهِكَ فَقَدْ أَصْبَحَ وَجْهُكَ أَحَبَّ الْوُجُوهِ إِلَيَّ وَاللَّهِ مَا كَانَ مِنْ دِينٍ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ دِينِكَ فَأَصْبَحَ دِينُكَ أَحَبَّ الدِّينِ إِلَيَّ وَاللَّهِ مَا كَانَ مِنْ بَلَدٍ أَبْغَضُ إِلَيَّ مِنْ بَلَدِكَ فَأَصْبَحَ بَلَدُكَ أَحَبَّ الْبِلاَدِ إِلَيَّ وَإِنَّ خَيْلَكَ أَخَذَتْنِي وَأَنَا أُرِيدُ الْعُمْرَةَ فَمَاذَا تَرَى فَبَشَّرَهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَأَمَرَهُ أَنْ يَعْتَمِرَ فَلَمَّا قَدِمَ مَكَّةَ قَالَ لَهُ قَائِلٌ صَبَوْتَ قَالَ : لاََ وَلَكِنْ أَسْلَمْتُ مَعَ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم، وَلاَ وَاللَّهِ لاَ يَأْتِيكُمْ مِنَ الْيَمَامَةِ حَبَّةُ حِنْطَةٍ حَتَّى يَأْذَنَ فِيهَا النَّبِيُّ صَلّى
.اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

অর্থ : ‌হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) নজদের দিকে অশ্বারোহী একটি দল পাঠালেন, তখন বনি হানিফার এক ছুমামা ইবনে আছল নামক ব্যক্তিকে তারা আটক করেন। তারা তাকে মসজিদের একটি স্তম্ভের সঙ্গে বেঁধে রাখে। নবী (সা.) তার দিকে বের হন এবং বলেন, তোমার কী আছে, হে ছুমামা? সে বলল, হে মুহাম্মদ! আমার কাছে কল্যাণ রয়েছে। যদি আপনি হত্যা করেন, তাহলে একজন প্রাণীকে হত্যা করবেন। আর যদি ইহসান করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে মুক্তি দেবেন। যদি আপনি সম্পদ চান, তাহলে যা ইচ্ছা চান। এভাবে দ্বিতীয় দিন অতিক্রম হলো। অতঃপর তাকে বললেন, তোমার কী খবর ছুমামা! তখন সে বলল, কথা তো আমি আগেই বলেছি, যদি মুক্তি দেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে মুক্তি দিবেন। তখন তাকে রেখে গেলেন, পরবর্তী দিন আসল, তখন তাকে বললেন, ছুমামা তোমার কী খবর? তখন সে বলল, খবর তো বলেছি। তিনি বললেন, তাকে মুক্তি দাও। তখন সে মসজিদের একটি নিকটবর্তী খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করে, তারপর আবার মসজিদে প্রবেশ করল। আর সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই ও মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। অতঃপর বলল, হে মুহাম্মদ! আল্লাহর কসম! পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারার চেয়ে ঘৃণিত চেহারা ছিল না। এখন আমার কাছে আপনার চেহারা সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেল পৃথিবীতে আপনার ধর্মের চেয়ে ঘৃণিত ধর্ম ছিল না। এখন আপনার ধর্ম আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ধর্মে পরিণত হলো। আল্লাহর কসম! আপনার শহরের চেয়ে ঘৃণিত চেহারা ছিল না। এখন আপনার শহরের চেয়ে প্রিয় শহর নেই। নিশ্চয়ই আপনার অশ্বারোহী দলের হাতে আমি পাকড়াও হয়েছি। আমি এখন ওমরা করতে চাই, আপনি কী বলেন? নবী (সা.) তাকে সুসংবাদ দিলেন এবং তাকে ওমরাহর অনুমতি দেন। যখন সে মক্কায় আসে, একজন তাকে বলল, তুমি তো পথভ্রষ্ট হয়েছে। তখন সে বলল, না বরং আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি মুহাম্মদের হাতে, আল্লাহর কসম! ইয়ামামা থেকে কোনো গমের দানাও নবী (আ.)-এর অনুমতি ছাড়া আসতে দিব না।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৩৭২)

এরকম অসংখ্য উদারতা ও সদাচারের উজ্জল দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।

ইসলামের উদারতায় প্রতিপক্ষ যোদ্ধাদের ইসলাম গ্রহণ

হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রের কয়েকজন সরদার মারা যায়। কেউ কেউ পালিয়ে যায়। তাদের পরিবার-পরিজন বন্দিরূপে এবং মালামাল গনিমত হিসেবে মুসলমানদের আয়ত্তে আসে। এর মধ্যে ছিল ছয় হাজার বন্দি, ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজারেরও বেশি বকরি এবং প্রায় চার মণ রুপা। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু সুফিয়ান বিন হারবকে গনিমতের এসব মালামালের ওপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। তার পরও হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রদ্বয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়; কিন্তু সব জায়গায় তারা পরাজিত হয়। শেষ পর্যন্ত তায়েফের এক মজবুত দুর্গে তারা আশ্রয় গ্রহণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ১০ থেকে ২০ দিন এই দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। ওরা দুর্গ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ নিক্ষেপ করতে থাকে। কিন্তু সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস তাদের ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এদের বদদোয়া দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এদের হিদায়েতের জন্য দোয়া করেন। তারপর তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে তিনি মক্কা গিয়ে ওমরা পালন, তারপর মদিনা প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর দোয়া কবুল করে তাদের হিদায়েত দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন জিরানা নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে। ঐতিহাসিক হুনাইনের যুদ্ধের পর নজিরবিহীন এক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যুদ্ধের পরই হাওয়াজিন গোত্রের অবশিষ্ট লোকেরা সদলবলে ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়।
সত্য, ন্যায় ও হিদায়েতের এই মিছিলে দলনেতা মালিক বিন আউফও যোগ দেন। যুদ্ধের প্রায় ২০ দিন পর এই ঘটনা ঘটে। ইতিমধ্যেই তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ-সম্পদ গনিমত হিসেবে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। এখানে নতুন সংকট দেখা দেয়, মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর তারা তাদের সম্পদের দাবি জানায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের দুটি বিষয়ের মধ্যে যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে বলেন। হয়তো তারা তাদের ওই সম্পদ ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অথবা সম্পদের পরিবর্তে তাদের ছয় হাজার যুদ্ধবন্দিকে ফেরত নিয়ে যাবে। তারা তাদের বন্দিদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সম্মত হয়। মুজাহিদদের ছাড়াও এই বিপুল সম্পদ থেকে সেসব নওমুসলিমদেরও একটা বিশেষ অংশ দেওয়া হয়, মক্কা বিজয়ের পর যারা মুসলমান হয়েছিল। তাদের অনেককে রাসুলুল্লাহ (সা.) ১০০ করে উট দান করেছেন। হাওয়াজিন গোত্রের নেতা মালিক বিন আউফকেও ১০০ উট দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে নিজ গোত্রের সরদারও বানিয়ে দেন। আগেও তিনি সেই গোত্রের সরদার ছিলেন, তবে সেটা ছিল অমুসলিম হিসেবে। এবার তিনি একই গোত্রের সরদার হয়েছেন মুসলমানদের নেতা হিসেবে। (ইবনে কাছির ও তাফসিরে মুনির)

অমুসলিমদের মসজিদে প্রবেশের অনুমতি

হানাফি মাজহাব মতে, অমুসলিমরা কোনো প্রয়োজন হলে মুসলমানদের অনুমতি নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে। ইমাম শাফেয়ি (রহ)-এর মতে, অমুসলিমরা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে পারবে না, তবে অন্য যেকোনো মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে। ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মতে, অমুসলিমরা হারাম শরিফে প্রবেশ করতে পারবে না, তবে অন্য যেকোনো মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে। ইমাম মালেক (রহ)-এর মতে, অমুসলিমরা মসজিদুল হারামসহ কোনো মসজিদেই প্রবেশ করা বৈধ নয়। কেননা কাবা শরিফ ও মসজিদুল হারামকে কেন্দ্র করেই অন্য সব মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
‘এই বছরের পর অমুসলিমরা যেন মসজিদুল হারামের কাছেও না আসে’-এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরও মহানবী (সা.)-এর যুগে বহু অমুসলিম মসজিদে প্রবেশের ঐতিহাসিক বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায়, এখানে আক্ষরিক অর্থে তাদের মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়নি; বরং অমুসলিমদের জন্য হজ ও ওমরাহ পালন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লামা রশিদ রেজা (রহ.) লিখেছেন, ‘ইসলামের ইতিহাস ও মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত সম্পর্কে বোদ্ধা মহল ভালোভাবেই জানে যে মুসলমানরা লেনদেন ও সামাজিকতার ক্ষেত্রে অমুসলিমদের সঙ্গে মিলেমিশেই থাকত। বিশেষত হুদাইবিয়ার সন্ধির পর বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে অমুসলিমদের কষ্ট দেওয়া, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সময় তাদের প্রতিনিধিরা মহানবী (সা.)-এর কাছে আসত এবং মসজিদে নববিতে প্রবেশ করত। একইভাবে নাজরানের ইহুদি-খ্রিস্টানরাও এসেছে। তাদের সঙ্গে কখনো ‘অপবিত্র’ আচরণ করা হয়নি। তাদের দেহ মিলিত হওয়ার দরুন কোনো কিছু ধৌত করতেও বলা হয়নি।’ (তাফসিরে মানার : ১/২৪২)
তা ছাড়া মক্কা বিজয়ের পর সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিরা নবী করিম (সা.)-এর কাছে এলে তাদের মসজিদে নববীতে অবস্থান করতে দেওয়া হয়। অথচ তারা তখনো অমুসলিম ছিল। (মা’আরেফুল কোরআন)

অমুসলিমদের দান-সদকা করার বিধান

সদকা শব্দটি সাধারণত নফল দান-অনুদান বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। সেই অর্থে যেকোনো অমুসলিমকে দান করা সব আলেমের ঐকমত্যে বৈধ। অমুসলিম প্রতিবেশী আক্রান্ত হলে, তারা বিপদগ্রস্ত হলে মুসলমানদের উচিত তাদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া।
আর সদকা শব্দটি কখনো জাকাত অর্থেও ব্যবহার করা হয়। এটি অমুসলিমদেরও দেওয়া যায়। কেননা তারা নিজেদের মুসলমান বলেই পরিচয় দেয়। ইহজগতে মানুষের কর্মকাণ্ড বাহ্যিক কাজকর্মের আলোকেই বিচার করা হয়। কারো অন্তরের খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই প্রকাশ্যে কারো সম্পর্কে কুফরির প্রমাণ পাওয়া না গেলে তার সঙ্গে মুসলমানদের মতো আচরণ করতে হবে। (বয়ানুল কোরআন)
তবে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি জাকাত অমুসলিমদের দেওয়া যাবে না। কেবল জাকাতের ক্ষেত্রে বিধানের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখা হয়েছে, অন্যথায় যেকোনো দান-সদকা, এমনকি ফিতরাও অমুসলিমদের দেওয়া যায়। এখানে লক্ষণীয় যে জাকাত দিতে হয় বছরে একবার। মুসলিম ধনীদের মধ্যে কারো প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা কিংবা এর অর্থমূল্য পরিমাণ সম্পদ মজুদ থাকলে এবং এর ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে তার ওপর জাকাত ওয়াজিব হয়। এটি ধনীদের সম্পদ থেকে ২.৫ শতাংশ আদায় করতে হয়। অন্যদিকে সদকা বছরের যেকোনো সময় অনির্দিষ্ট পরিমাণ মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে দেওয়া যায়। তা ছাড়া সদকা ধনীরা ছাড়াও মোটামুটি সচ্ছল যে কেউ আদায় করতে পারে।

অমুসলিম আত্মীয়স্বজনের অধিকার

সমাজবদ্ধভাবে জীবনযাপন করতে গিয়ে নানা শ্রেণির, নানা পেশার, নানা মত ও পথের মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। মুখোমুখি হতে হয় অমুসলিমদেরও। অমুসলিম ব্যক্তি হতে পারে কোনো মুসলমানের প্রতিবেশী। যদি কারো প্রতিবেশী কিংবা কোনো আত্মীয় অমুসলিম হয়, ইসলামের নির্দেশনা হলো : তার সঙ্গেও প্রতিবেশী বা আত্মীয়তার অধিকার রক্ষা করে চলতে হবে।
আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার আত্মীতার বন্ধন অটুট রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৩৮)
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট ভাষায় অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সম্পর্ক রক্ষা করতে বলা হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমার পিতামাতা যদি এমন কাউকে (প্রভুত্বে) আমার সমকক্ষ সাব্যস্ত করার জন্য তোমাকে চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান (দলিল ও প্রমাণ) নেই, তবে তাদের কথা মানবে না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদাচরণ করো। আর এমন ব্যক্তির পথ অনুসরণ করো, যে একান্তভাবে আমার অভিমুখী হয়েছে। তারপর তোমাদের সবাইকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি তোমাদের সে বিষয়ে অবহিত করব, যা তোমরা করতে।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৫)

হজরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) থেকে বর্ণিত,

عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَتْ قَدِمَتْ عَلَيَّ أُمِّي وَهْيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ {إِنَّ أُمِّي
.قَدِمَتْ} وَهْيَ رَاغِبَةٌ أَفَأَصِلُ أُمِّي قَالَ نَعَمْ صِلِي أُمَّكِ

অর্থ : তিনি বলেন, রাসুলের যুগে আমার মা আমার কাছে আসেন। তখন তিনি মুশরিক ছিলেন। তখন আমি রাসুল (সা.) থেকে ফাতওয়া তালাশ করে বললাম, আমার মা এসেছে, তিনি ইসলাম ধর্মবিমুখ। আমি কি তাঁর আত্মীয়তা রক্ষা করব? তখন তিনি বলেন, হ্যাঁ তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তা রক্ষা করো। (বুখারি, হাদিস : ২৬২০)

ইসলামের প্রধান লক্ষ্য মানবতার কল্যাণ। মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে বৈরী মনোভাব দূর করা জন্য পারস্পরিক লেনদেন, দান-অনুদান বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। মানবতার বাসযোগ্য একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গঠনের বিকল্প নেই।

লেখক : তাফসিরকারক ও সাংবাদিক
kasemsharifcu@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন