দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মুসলমানদের করণীয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

কিছুদিনের টানা আকাশ ফাটা বৃষ্টি ও আগাম বন্যায় সিলেট ও ময়মনসিংহের হাওর এলাকায় ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। এবার বন্যা দেখা দিতে শুরু করেছে চলনবিলেও। এদিকে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে সোনালি ফসল পানির নিচে ডুবে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও কৃষকের স্বপ্নের ফসলে পচন ধরেছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
বৃষ্টি আল্লাহর রহমত
বৃষ্টি আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। অনাবৃষ্টিতে যেমন মাটি কাঠ হয়ে যায়, ফসলের অভাবে দুনিয়ায় হাহাকার শুরু হয়, তেমনি প্রবল বৃষ্টিও মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই অনাবৃষ্টি কিংবা অতিবৃষ্টিতে আল্লাহর দরবারেই প্রত্যাবর্তন করা উচিত। পবিত্র হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.)-এর যুগে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সে সময় কোনো এক জুমায় নবী (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন এক বেদুইন উঠে দাঁড়াল এবং আরজ করল, হে আল্লাহর রাসুল! (বৃষ্টির অভাবে) সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পরিবার-পরিজনও অনাহারে রয়েছে। তাই আপনি আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য দোয়া করুন। তিনি দুই হাত তুললেন। সে সময় আমরা আকাশে এক খণ্ড মেঘও দেখিনি। যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ (করে বলছি)! (দোয়া শেষে) তিনি দুই হাত (তখনো) নামাননি, এমন সময় পাহাড়ের মতো মেঘের বিরাট বিরাট খণ্ড উঠে এলো। অতঃপর তিনি মিম্বর থেকে নিচে নামেননি, এমন সময় দেখতে পেলাম তাঁর দাড়ির ওপর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। সেদিন আমাদের এখানে বৃষ্টি হলো। এর পরে ক্রমেই দুই দিন এবং পরে জুমা পর্যন্ত প্রতিদিন। (পরে জুমার দিন) সে বেদুইন অথবা অন্য কেউ উঠে দাঁড়াল এবং আরজ করল, হে আল্লাহর রাসুল! (বৃষ্টির কারণে) এখন আমাদের বাড়িঘর ধসে পড়ছে, সম্পদ ডুবে যাচ্ছে। তাই আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তখন তিনি দুই হাত তুললেন এবং বললেন : হে আল্লাহ, আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় (বৃষ্টি দাও), আমাদের ওপর নয়। (দোয়ার সময়) তিনি মেঘের একেকটি খণ্ডের দিকে ইশারা করছিলেন, আর সেখানকার মেঘ কেটে যাচ্ছিল। এর ফলে চতুর্দিকে মেঘ পরিবেষ্টিত অবস্থায় ঢালের মতো মদিনার আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল এবং কানাত উপত্যকার পানি এক মাস ধরে প্রবাহিত হতে লাগল, তখন (মদিনার) চারপাশের যেকোনো অঞ্চল থেকে যে কেউ এসেছে, সে এ প্রবল বৃষ্টির কথা আলোচনা করেছে। (সহিহ বুখারি : ৯৩৩)
বজ্রপাতের সময় করণীয়
আল্লাহ তাআলার শক্তির নিদর্শনগুলোর একটি, যা তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের সাবধান করার জন্য রেখেছেন। তিনি চাইলেই যে কাউকে এর মাধ্যমে যেকোনো সময় শাস্তি দিতে পারেন। যদিও সব ক্ষেত্রে পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা এমনটি করেন না। যা আল্লাহ তাআলা নিজেই পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন, ‘বজ্র তাঁরই তাসবিহ ও হামদ জ্ঞাপন করে এবং তাঁর ভয়ে ফেরেশতারাও (তাসবিহরত রয়েছে)। তিনিই গর্জমান বিজলি পাঠান, তারপর যার ওপর ইচ্ছা তাকে বিপদরূপে পতিত করেন। আর তাদের (অর্থাৎ কাফেরদের) অবস্থা এই যে তারা আল্লাহর সম্পর্কেই তর্ক-বিতর্ক করছে, অথচ তাঁর শক্তি অতি প্রচণ্ড। (সুরা : রাদ, আয়াত : ১৩)
মানুষের কাজ-কর্মই বজ্রপাতের মূল কারণ। খোদাদ্রোহিতা, জিনা, ব্যভিচার, পরকীয়া, অন্যায়, অত্যাচার ইত্যাদি নাফরমানিই এ ধরনের আজাবকে ডেকে আনে। এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রিয় নবী (সা.) তাঁর উম্মতদের বিভিন্ন দোয়া শিখিয়েছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) যখন বজ্রের শব্দ শুনতেন, তখন বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা লা তাকতুলনা বিগজাবিকা ওয়ালা তুহলিকনা বিআজাবিকা ওয়া আ-ফিনা কবলা জালিকা। ’ (তিরমিজি : ৩৪৫০)
অন্য রেওয়ায়েতে আছে, হজরত ইবনে আবি জাকারিয়্যা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি বজ্রের আওয়াজ শুনে এ দোয়া পড়বে, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’, সে বজ্রে আঘাতপ্রাপ্ত হবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ২৯২১৩)
এ ছাড়া বেশি বেশি তাওবা ও সদকা করার মাধ্যমে আমরা সব ধরনের দুর্যোগ থেকে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে পরিত্রাণ চাইতে পারি। কেননা হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমাদের প্রবল পরাক্রমশালী প্রভু বলেছেন, ‘যদি আমার বান্দারা আমার বিধান মেনে চলত, তবে আমি তাদের রাত্রি বেলায় বৃষ্টি দিতাম, সকাল বেলায় সূর্য দিতাম এবং কখনো তাদের বজ্রপাতের আওয়াজ শুনাতাম না। ’ (মুসনাদে আহমাদ : ৮৭০৮)
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন