মত প্রকাশের স্বাধীনতাই আরব বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন

জামাল খাসোগি নিহত হওয়ার পর তার লেখা শেষ নিবন্ধটি প্রকাশ করে ওয়াশিংটন পোস্ট। নিবন্ধের শুরুতে একটি ভূমিকা লেখেন ওয়াশিংটন পোস্টের আন্তর্জাতিক মতামত বিভাগের সম্পাদক কারেন আত্তিয়া। ভূমিকাসহ লেখাটির অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ নোমান

———

যেদিন জামাল ইস্তান্বুলে নিখোঁজ হয়েছে বলে খবর এসেছিল তার পরের দিন জামালের সেক্রেটারি এবং অনুবাদকের পক্ষ থেকে এই নিবন্ধটি আমার হাতে এসে পৌঁছায়। ওয়াশিংটন পোস্ট লেখাটির প্রকাশনা একটু পিছিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ আমরা আশা করছিলাম যে, জামাল ফিরে আসবে এবং আমরা দু’জনে মিলে এক সাথে লেখাটির সম্পাদনা করবো।এখন আমাকে মেনে নিতে হচ্ছে যে, সেটা হওয়ার আর কোন সম্ভাবনা নেই। এটাই তার সর্বশেষ নিবন্ধ, যেটা আমি ওয়াশিংটন পোস্টের জন্য সম্পাদনা করবো। আরব বিশ্বে জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতি তার যে প্রবল দায়িত্ববোধ এবং আকাঙ্খা ছিল – তার একটি উজ্জ্বল নমুনা হয়ে থাকবে এই লেখাটি। যে স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের জীবনকেও বিলিয়ে দিয়েছেন। আমি সব সময় তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো এই কারণে যে, তিনি এক বছর পূর্বে ওয়াশিংটন পোস্টকে তার সাংবাদিক জীবনের সর্বশেষ ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এবং আমাদেরকে এক সাথে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিলেন।

কারেন আত্তিয়া
ওয়াশিংটন পোস্টের আন্তর্জাতিক মতামত বিভাগের সম্পাদক

———

আমি শেষ দিকে এসে ফ্রিডম হাউজের পক্ষ থেকে ২০১৮ সালের ‘সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা’র বিষয়ে যে র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয়েছে সেটা খুঁজতেছিলাম। আমি একটি ভয়ংকর তথ্যের মুখোমুখি হলাম। গোটা আরব বিশ্বের মধ্যে একটি মাত্র দেশ ‘স্বাধীন’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। সেটা তিউনিশিয়া। এর পরের ক্যাটাগরি ‘আংশিক স্বাধীন’-এ নাম উঠে এসেছে জর্ডান, মরক্কো এবং কুয়েতের। এছাড়া আর বাকি সকল আরব রাষ্টকে ‘পরাধীন’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে।

এই কারণে, এসব রাষ্ট্রে বসবাসকারী নাগরিগণ হয়তো এসব তথ্য জানতেই পারে না, অথবা তাদেরকে বিভ্রান্তির মধ্যে রাখা হয়। যে সব বিষয় ও ঘটনা আরব অঞ্চলকে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে – তারা সেগুলোরও কোন সুরাহা করতে পারে না। জনসম্মুখে সেগুলো নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা তো অনেক দূরের কথা। রাষ্ট্রযন্ত্র যেসব তথ্য সরবরাহ করে সেগুলোই জনগণকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যদিও জনগণের বৃহৎ একটি অংশ এগুলো বিশ্বাস করে না, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এসব অসত্য তথ্যের শিকারে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনেরও খুব একটা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

সাংবাদিক, শিক্ষক থেকে নিয়ে সাধারণ জনগণও তাদের দেশে একটি সুন্দর, আলোকিত ও স্বাধীন সমাজব্যাবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে নিজেদের মতামত এবং আশাগুলোকে অকপটে প্রকাশ করতো। তারা তাদের সরকারগুলোর আধিপত্যের জাল ছিন্ন করার স্বপ্ন দেখতো। তথ্যের উপর, সাংবাদিকতার উপর সরকারের নিয়মিত হস্তক্ষেপ এবং বিরামহীন নজরদারি রুখে দেয়ার স্বপ্ন দেখতো।

২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় গোটা আরব দুনিয়া আশায় বুক বেঁধেছিল। সাংবাদিক, শিক্ষক থেকে নিয়ে সাধারণ জনগণও তাদের দেশে একটি সুন্দর, আলোকিত ও স্বাধীন সমাজব্যাবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে নিজেদের মতামত এবং আশাগুলোকে অকপটে প্রকাশ করতো। তারা তাদের সরকারগুলোর আধিপত্যের জাল ছিন্ন করার স্বপ্ন দেখতো। তথ্যের উপর, সাংবাদিকতার উপর সরকারের নিয়মিত হস্তক্ষেপ এবং বিরামহীন নজরদারি রুখে দেয়ার স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু খুব দ্রুতই এসব আশা ধুলোয় মিশে যায় এবং এই সমাজগুলো হয়তো পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়, অথবা তার চেয়েও বেশি কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

আমার প্রিয় বন্ধু, সৌদিআরবের প্রসিদ্ধ লেখক সাংবাদিক সালিহ আল শিহ্হী সৌদি মিডিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি কলামের লেখক ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তিনি আজ পাঁচ বছর ধরে জেলে বন্দি আছেন কেবল মাত্র এমন কিছু মতামত প্রদান করার অপরাধে, সৌদি সরকার যেগুলোকে নিজেদের রোডম্যাপের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করেছিল। মিসর সরকারের ‘আল মাসরী আল ইয়াউম’ পত্রিকাকে জোর করে দখল করে নেয়ার ঘটনা এখন আর সাংবাদিক বন্ধুদের ক্ষোভকে জাগ্রত করে না। তাদের কোন প্রতিক্রিয়াও দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক মহলও এখন আর এধরণের অপকর্মগুলোর কার্যকর প্রতিবাদ করছে না; বরং মৃদু প্রতিবাদ আর হালকা নিন্দা জানানোতেই সীমিত থাকছে। তারপর দীর্ঘ নিরবতা।

এর দ্বারা কার্যত আরব রাষ্ট্রগুলোকে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের টুটি চেপে ধরার জন্য সুবর্ণ সুযোগ দেয়া হয়। একসময় সাংবাদিকরা মনে করতো যে, ইন্টারনেটের এই যুগে তথ্য এবং মিডিয়ার উপর সরকারের নজরদারি এবং দখলদারিত্ব অনেকাংশে কমে আসবে, যেগুলো প্রিন্ট মিডিয়ার উপর করা হচ্ছে। কিন্তু এই সব সরকার, যেগুলো মূলত টিকে আছে মানুষের তথ্য-স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে, সেগুলো ইন্টারনেটকেও প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত করে। স্থানীয় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন প্রচারের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যাতে এই খাতের আয় থেকে সংবাদমাধ্যমগুলেকে বঞ্চিত করা যায়।

কম হলেও এখনও পর্যন্ত কিছু কিছু সেক্টর অক্ষত আছে, যেগুলো আরব বসন্তের চেতনা বহন করে চলেছে। প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা দলনের বিপরীতে কাতার সরকার আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে তিউনিশিয়া এবং কুয়েতের সংবাদ মাধ্যম তুলনামূলক স্বাধীন হলেও সেগুলো স্থানীয় ইস্যুকেই বেশি কভার করে। আরব বিশ্ব যে সব বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মোকাবেলা করছে সেগুলোকে এড়িয়ে যায়। তারা মিশর, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের মতো দেশের সাংবাদিকদের জন্য নূন্যতম কোন প্লাটফর্ম তৈরি করে দিতেও সংকোচবোধ করে। এমনকি লেবানন, যাকে আরবি মুকুটের হিরকখণ্ড বলা হয়, সেটাও ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর প্রভাবের বলি হয়ে আছে।

আরব বিশ্ব আজ বহিঃশক্তিগুলোর পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেয়া একটি বিশেষ ধরণের লৌহ পর্দার মোকাবেলা করছে, যেটা তারা সরাসরি তৈরি না করে স্থানীয় প্রতিদ্বন্ধী শাসকদের মাধ্যমে তৈরি করেছে। স্নায়ু যুদ্ধের সময়টাতে ‘রেডিও ফ্রি ইউরোপ’ – যেটি কালের পরিক্রমায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল – স্বাধীনতার আশাকে মজবুত এবং স্থায়ী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আরবদেরও ঠিক এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। ১৯৬৭ সালে নিউউয়র্ক টাইমস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট মিলে যৌথভাবে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনের মতো একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে সম্মত হয়েছিল, যেটা বিশ্বের সকল স্বাধীন মত প্রকাশের একটি উম্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট আমার অনেকগুলো নিবন্ধ অনুবাদ করার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সেগুলো আরবি ভাষাতেই প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমি এজন্য কৃতজ্ঞ। আরবদের তাদের নিজেদের ভাষাতেই পড়তে হবে, যাতে তারা আমেরিকা এবং পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থাকে সঠিক ভাবে বুঝতে পারে এবং এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে পারে।

ওয়াশিংটন পোস্ট আমার অনেকগুলো নিবন্ধ অনুবাদ করার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সেগুলো আরবি ভাষাতেই প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমি এজন্য কৃতজ্ঞ। আরবদের তাদের নিজেদের ভাষাতেই পড়তে হবে, যাতে তারা আমেরিকা এবং পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থাকে সঠিক ভাবে বুঝতে পারে এবং এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে পারে। যদি একজন মিশরীয় নাগরিক এমন একটি নিবন্ধ পড়তে পারে, যেটাতে ওয়াশিংটন শহরে একটি স্থাপনা নির্মানের প্রকৃত ব্যায় সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে – তাহলে সে তার দেশেও এমন একটি প্রজেক্ট নির্মাণ করার ব্যাপারে এবং এর ফলাফল সম্পর্কে ভালো করে জানার তুলনামূলক বেশি সুযোগ লাভ করবে।

আরব বিশ্ব এখন এ ধরণের উন্নতমানের উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রতি খুবই মুখাপেক্ষী। এতে তারা বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর ব্যাপারে আরও ভালো ভাবে অবগত হতে পারবে। তার চেয়েও যেটা বেশি প্রয়োজন এবং গুরুত্ববহ, সেটা হচ্ছে, আরবদের আওয়াজগুলো যাতে প্রাকাশিত হতে পারে সেজন্য তাদেরকে উপযুক্ত প্লাটফর্মের ব্যাবস্থা করে দেয়া। আমরা দারিদ্রতা, অ-ব্যাবস্থাপনা এবং ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যাবস্থার মতো বহুবিদ সমস্যায় জর্জরিত। যদি একটি স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানের ক্লাব তৈরি করা যায় – যেটা প্রচারমাধ্যমকে ব্যাবহার করে প্রতিনিয়ত ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকা চিরাচরিত আরব জাতীয়তাবাদী সরকারগুলোর প্রভাবমুক্ত থাকবে – তাহলে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ নিজেদের সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবার এবং সেগুলো থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার সুযোগ পাবে।

মুহাম্মাদ নোমান
মাস্টার্স অব ফিলোসফি রিসার্চার, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন