সওয়াব কী ও কেন

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
‘সওয়াব’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো প্রতিদান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতিদান চাইবে, আমি তাকে তার অংশ দিয়ে দেব। আর যে ব্যক্তি পরকালের প্রতিদান চাইবে, আমি তাকে তার অংশ দিয়ে দেব। আর যারা কৃতজ্ঞ, আমি শিগগিরই তাদেরকে তাদের পুরস্কার দিয়ে দেব।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৫)

প্রখ্যাত ইসলামী পরিভাষাবিদ আল্লামা জুরজানি (রহ.) সওয়াবের সংজ্ঞায় বলেন, ‘সওয়াব হলো ওই বস্তু, যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের উপযুক্ত হওয়া যায় এবং মহানবী (সা.)-এর সুপারিশ পাওয়া যায়।’ এ ব্যাপারে মুফতি জামালুদ্দীন সুবহানি (রহ.)-এর ব্যাখ্যা চমৎকার! তিনি বলেন, ‘সওয়াব হলো জান্নাতের মুদ্রা। দুনিয়ায় যেমন যার কাছে মুদ্রা ও অর্থ বেশি থাকে, তার জীবনযাত্রাও উন্নত হয়। ইচ্ছা হলেই যেকোনো জিনিস ভোগ করতে পারে। আর যার কাছে অর্থকড়ি কম থাকে, তার জীবনযাত্রা নিম্নমানের হয়ে থাকে। তেমনি জান্নাতে যার আমলনামায় সওয়াব যত বেশি থাকবে, সে তত বেশি সুখ ভোগ করতে পারবে। জান্নাতে সব মানুষের মর্যাদা নির্ণীত হবে সওয়াবের আধিক্যের মাধ্যমে।’

সওয়াব পাওয়ার শর্ত : সওয়াব পাওয়ার জন্য কোনো কাজে বিশুদ্ধ নিয়ত থাকতে হবে। নিয়ত ছাড়া কোনো কাজে সওয়াব মেলে না। কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তাদের কেবল এই আদেশই করা হয়েছিল যে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, খালেস ও একনিষ্ঠভাবে তাঁরই আনুগত্য করবে এবং নামাজ কায়েম করবে ও জাকাত দেবে। আর এটাই সরল-সঠিক দ্বীন।’ (সুরা : বায়্যিনাহ, আয়াত : ৫)

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ীই প্রতিদান পাবে।’ (সহিহ বুখারি)

আমল না করলেও নিয়তের কারণে সওয়াব হয় : মানুষ কখনো কখনো ভালো নিয়তের কারণে আমল না করেও সওয়াব পেয়ে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের আশা করল, অতঃপর তা করতে পারল না, তবুও তার জন্য সওয়াব লেখা হবে।’ (সহিহ বুখারি)

অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি শয়নকালে রাত্রিবেলায় তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার নিয়ত করে শুয়েছে, কিন্তু অতিরিক্ত ঘুমের চাপে ভোর হয়ে গেছে, সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। তার ঘুমই আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব হিসেবে গণ্য হবে।’ (নাসাই শরিফ : ৩/২৫৮)

কাফির ব্যক্তি কি সওয়াবের অধিকারী হবে? পরকালে কোনো ভালো কাজের প্রতিদান পাওয়ার জন্য ইমান আনয়ন করা পূর্বশর্ত। ইমান ছাড়া যত ভালো কাজই করুক না কেন, আল্লাহ তাআলার কাছে তা অগ্রাহ্য হবে। ইমান না এনে পরকালে প্রতিদান পাওয়ার আশা করা অনর্থক। তবে কাফিরদের ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ায় দিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রতিদান কোনো না কোনোভাবে তারা দুনিয়ায় পেয়ে যাবে। (শরহে মুসলিম : ১৭/১৫০, ফাতাওয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত : ১/১৬৬)

রাসুল (সা.) হজরত ওমর ইবনুল আস (রা.)-কে তাঁর পিতার সম্পর্কে বলেন, ‘যদি তিনি মুসলমান হতেন, আর তুমি তাঁর পক্ষ থেকে গোলাম আজাদ করতে, সদকা প্রদান করতে ও হজ আদায় করতে, তাহলে তিনি সে সওয়াব পেতেন। কিন্তু তিনি মুসলমান না হয়ে মারা যাওয়ার কারণে এসব করলে তাঁর কোনো উপকার হবে না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৮৮৩)

অন্যকেও সওয়াব পাঠানো যায় : নামাজ, রোজা, হজ, সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি আদায় করে অন্যকে সওয়াব পাঠানো যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিজের ও সব মুমিন-মুমিনার জন্য ক্ষমা চাও।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ১৯)

একবার রাসুল (সা.) দুটি সাদা-কালো রঙের বকরি কোরবানি করেছিলেন। একটি নিজের পক্ষ থেকে অন্য উম্মতের সওয়াবের উদ্দেশ্যে। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৪/২২)

হজরত আমর ইবনুল আস (রা.)-কে লক্ষ্য করে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানের পক্ষ থেকে তুমি গোলাম আজাদ করলে, সদকা করলে ও হজ করলে সে তার সওয়াব পাবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৮৮৩) উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায় যে নিজে আমল করেও অন্যকে সওয়াব পৌঁছানো যায়।

বিপদাপদের কারণে সওয়াব : আল্লাহ তাআলা এতই মেহেরবান যে তিনি কোনো কারণে আমাদের ওপর আপতিত বিপদাপদের বিনিময়েও সওয়াব দিয়ে থাকেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যেসব বিপদাপদ আসে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তার পাপ মাফ করে দেন। এমনকি শরীরে কাঁটা ফুটলেও এর কারণে পাপ মোচন হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৪০) মুসতাদরাকে হাকেমের একটি বর্ণনায় আছে, ‘তার জন্য একটি নেকি লেখা হবে এবং তার মর্যাদা এক ধাপ বৃদ্ধি করা হবে।’ (হাদিস : ১২৮৪)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৪১)

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন