শাইখুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.) : আরেক মনীষীর প্রস্থান

রাকিবুল হাসান

শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)। উপমহাদেশের সর্বজন বরেণ্য এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় শাইখুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.)- এর নামেই নাম। আমি যে একজন যাকারিয়ার কথা বলছি, তিনি বাংলাদেশের, দারুল উলুম মাদানীনগরের। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। এখন তার নাম নিলে পরম বিনয়ে বলতে হয় রহমাতুল্লাহি আলাইহি।

তাঁর শাইখুল হাদীস হওয়ার শানদার গল্পটা শুরু হয়েছিলো ভারতের রাজস্থানে। আচমকা। তখন তিনি হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরীর খেদমতে। রাজস্থানের এক মাদরাসার জন্য শাইখুল হাদীস তলব করা হলো। সাঈদ আহমদ পালনপুরী যাকারিয়া (রহ.)কে দেখিয়ে বললেন, ‌‘ইসে লে যাও।’

সেই যে শুরু হয়েছিলো, আলো ছড়ানো থামেনি। আলো ছড়াতে ছড়াতে দেশে ফিরলেন। সাভারে কিছুদিন, তারপর জামিয়া আারাবিয়া এমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ, অতঃপর এসে স্থিত হলেন মাদানীনগর মাদরাসায়। শায়খ ইদ্রীস সন্দ্বীপী (রহ.)- এর সুশীতল সান্নিধ্য-ছায়ায়। এই মাদানীনগরের প্রাঙ্গনে কেটে গেছে তাঁর ২২ বছর। শাইখুল হাদীসের তকমাখচিত মুকুট পরে হাদীসের মসনদে দ্যুতি ছড়িয়েছেন এই সুদীর্ঘ সময়।

এতটাই সরল জীবন ছিলো তাঁর, সেই সারল্য কোন ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা যায় না। তবে ক্যানভাসে দারুণ উছ্বাসে ফুটিয়ে তোলা যাবে তার সত্যকঠিন একটা অবয়ব। যখনই মঞ্চে বসতেন, বসতেন জুমার বয়ানে, অপ্রিয় সত্যগুলো তুলে ধরতেন। দ্বীধায় সামান্যও কাঁপতো না তার স্বর। প্রচলিত কিছু সত্য, আমরা কখনোই উচ্চারণ করি না, তিনি উচ্চারণ করতেন প্রবল প্রতাপে।

এই বছর যারা হযরতের কাছে বুখারী পড়ছে, তাদের আজন্ম একটা আক্ষেপ রয়েই গেলো। বুখারীর শেষটা হযরতের কাছে হলো না বলে। বলছিলেন দারুল হাদীসের ছাত্র আবু সাঈদ, ‘হুজুরের তাকরীর ছিলো সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুসমৃদ্ধ। একজন শায়খ ঠিক যেমন হওয়ার কথা ছিলো। হুজুরের এই শূণ্যতা পূরণ হবার নয়। হুজুরের ইন্তেকালের খবর শুনে, তাকমিল জামাতে কান্নার যে রোল পড়েছিলো, যেন সবাই আপনজনের চেয়েও অতি আপন কাউকে হারিয়েছে। সবার মনেই এখন আক্ষেপ, আহ! হুজুরের কাছে দরস শেষ হলো না।’

১০ নভেম্বর সকাল থেকেই শরীরটা ভালো যাচ্ছিলো না। তাই ক্লাস করেননি। দুপুর দুইটায় এপয়েন্টমেন্ট ছিলো ডা. প্রফেসর মুহিব্বুর রহমানের কাছে। হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন যখন, তখন মাদানীনগর মসজিদে মাগরীবের জামাত শেষ। হযরত সিঁড়ি বেয়ে উঠলেন। রুমে এসে নামাজ পড়লেন। তারপর মৌন জিকির করতে করতে হয়তো অস্বস্তি অনুভব করলেন। বললেন, আমাকে শুইয়ে দাও।

রবের নাম জপতে জপতে শায়িত হলেন চিরনিদ্রায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। তাঁর দারাজাত বুলন্দ করুন- আমীন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন