বেশিরভাগ ইসলামি দল আ.লীগের সঙ্গে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ ইসলামি দল আওয়ামী লীগ এবং এর মিত্র জাতীয় পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এবার ভোটের রাজনীতিতে সক্রিয় আছে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৭০টি ইসলামি দল ও সংগঠন। এর মধ্যে ২৯টি দল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। ৩২টি দল আছে জাতীয় পার্টির সঙ্গে, যারা ভোটের মাঠে সরকারের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। আর বিএনপির সঙ্গে আছে ৫টি দল।

তবে দুটি দল—চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (আতাউল্লাহ) এখন পর্যন্ত কোনো দিকে যায়নি। তবে বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ তার আগে-পরে ইসলামী আন্দোলনের প্রতি সরকার কিছুটা নমনীয় ছিল।

এ প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, ‘সব সময় আমরা সভা-মাহফিলের যে সুযোগ পাই, তা না। বিএনপি, জাতীয় পার্টিও সমাবেশ করে। তবে আমাদের প্রতি সরকারের একটা সুনজর থাকতে পারে এ কারণে যে আমরা হাঙ্গামা করি না। প্রশাসন আমাদের ঝুঁকি মনে করে না।’ তিনি বলেন, ‘সাময়িক সুবিধা পাওয়ার জন্য অনেকে অন্য জোটে যাচ্ছে। আমরা জোট, নোট, চোট এগুলোকে সতর্কভাবে এড়িয়ে চলছি।’

সর্বশেষ সম্মিলিত ইসলামী জোট নামে নতুন একটি জোটের আত্মপ্রকাশ হয় ৩ নভেম্বর। এই জোটের শরিক দল আটটি। এই জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা জাফরুল্লাহ খান দীর্ঘদিন প্রয়াত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ছিলেন। সম্প্রতি তিনি ওই দলের মহাসচিবের পদ হারান। এরপর তিনি খেলাফত আন্দোলনের একাংশ নিয়ে নতুন দল করেন। এত দিন তাঁর অবস্থান ছিল সরকারের বিরুদ্ধে। চলতি মাসে জাফরুল্লাহ খান আটটি অনিবন্ধিত সংগঠন নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী জোট গঠন করেন। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচন করতে চায়। জোটের নেতারা গত শুক্রবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকের বিষয়ে সম্মিলিত ইসলামী জোটের কো-চেয়ারম্যান মুফতি ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ১০টি আসনের প্রার্থী তালিকা দিয়েছি। ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে আমাদের জানাবেন।’

মুফতি ফখরুলও খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। এখন তিনি বাংলাদেশ জনসেবা আন্দোলন নামে নতুন দল গঠন করেছেন।

গত সেপ্টেম্বর মাসে ১৫টি দল নিয়ে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (আইডিএ) নামের আরেকটি জোটের আত্মপ্রকাশ হয়। এর চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী, কো-চেয়ারম্যান লক্ষ্মীপুর-১ আসনের তরীকত ফেডারেশনের সাংসদ এম এ আউয়াল। এই দুজন দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন। এই জোট সাতটি আসন চেয়ে সরকারের কাছে তালিকা দিয়েছে।

এম এ আউয়াল বলেন, ‘আমরা জাকের পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (বাহাদুর শাহ), সাইফুদ্দীন মাইজভান্ডারীর দল সুপ্রিম পার্টিসহ আরও কয়েকটি দলকে অন্তর্ভুক্ত করে জোট পুনর্গঠন করছি। আশা করছি পাঁচ থেকে সাতটি আসন পাব।

নির্বাচন কমিশনে এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। এর মধ্যে ইসলামপন্থী দল ১০টি। এর মধ্যে ছয়টিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন (নজিবুল বশর) আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে, আর ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (বাহাদুর শাহ) মহাজোটের শরিক। বাকি চারটি দল ইসলামী ঐক্যজোট (নেজামী), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান) ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মান্নান) ও জাকের পার্টির (মোস্তফা আমীর) সঙ্গে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে আছে দুটি দল—খেলাফত মজলিস (ইসহাক) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (আবদুল মোমেন)। নিবন্ধিত বাকি দুটি ইসলামি দল ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন (আতাউল্লাহ) কোনো দিকে যায়নি এখনো।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, ‘কে কোন উদ্দেশ্যে জোট পরিবর্তন করেছেন, নতুন নতুন ঘনিষ্ঠতা তৈরি করছেন, এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষ অনেক সচেতন। আদর্শ বদল করে নিজের চাওয়া-পাওয়ার জন্য যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের কথায় মানুষ ভোটের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে বলে মনে করি না।’

নিবন্ধিত দলের বাইরে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে বড় দল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট (একাংশ) বিএনপির সঙ্গে ২০-দলীয় জোটে আছে।

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই পীর) ও ইসলামী ঐক্যজোট (আমিনী) ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। এবার ইসলামী ঐক্যজোটের এই অংশ বিএনপির সঙ্গে নেই। জামায়াত নিবন্ধন ও প্রতীক হারিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন স্বতন্ত্র অবস্থানে আছে।

এর মধ্যে প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোট (নেজামী) ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বিএনপির জোট থেকে বেরিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সমর্থনে আমিনীর ছেলে আবুল হাসানাত আমিনীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে প্রার্থী করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

অবশ্য ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী দাবি করেন, আসন নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁদের কোনো সমঝোতা হয়নি। সে চেষ্টাও তাঁরা করেননি।

আর প্রয়াত শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মান্নান) সম্প্রতি এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনী জোট করেছে। শায়খুল হাদিসের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও একসময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে ছিল। সেখান থেকে বের হলে ২০০৬ সালে খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ পাঁচ দফা চুক্তি করেছিল। পরে বিতর্কের মুখে আওয়ামী লীগ সেই চুক্তি বাতিল করে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ‘সম্মিলিত ইসলামী মহাজোট’ নামে একটি ৩৪-দলীয় মোর্চার সঙ্গে জোট করেন। তাঁর এই জোট গঠন সরকারকে সহায়তার লক্ষ্যে বলে প্রচার আছে। এরশাদের জোটের দুটি দলের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন আছে। দল দুটি হলো বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান) ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মান্নান)। বাকি দলগুলো অপরিচিত ও নামসর্বস্ব।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন