রাসুল (সা.)-এর শেষ দিনগুলো

মুফতি মাহমুদ হাসান 

পাপের বিভীষিকাময় অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে নূর ও হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করে ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত আরব উপদ্বীপ থেকেই হয় নবুয়তের সূর্যোদয়। আর সেই আলোকরশ্মির ঝলক গোটা দুনিয়াকে দীপ্তিময় করে দিয়েছে।

মানবতা ফিরে পেয়েছে তার হারানো বসন্ত, বসন্ত ফিরে পেয়েছে তার স্নিগ্ধতা। কুফর-শিরকে নিমজ্জিত পাষণ্ড আত্মায় তাওহিদের নির্মল পানি সঞ্চারিত হয়েছে। আর দিগ্ভ্রান্ত বিবেক পেয়েছে তার আলোর পথ। যে মানুষগুলো ছিল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম পশুসম, তারাই পরিণত হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সোনালি সত্তায়।

বিদায়ের প্রস্তুতি : বিদায় হজের পর থেকেই রাসুল (সা.)-এর মধ্যে আখিরাতের সফরের আনন্দ-অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছিল, প্রিয় সাহাবিদের বিদায় ও তাঁর ইন্তেকালের পর সাহাবিদের অবস্থা সম্পর্কেও কিছু কিছু দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা আসছিল, যাতে দিকনির্দেশনা ও সতর্কতামূলক অনেক বাণী ছিল। (বুখারি, ১৩৪৪)

মৃত্যুরোগে আক্রান্ত : ১১ হিজরির সফর মাসের শেষ দিকে রাসুল (সা.) শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। সেই দিনটি ছিল সোমবার, ওই রাতেই রাসুল (সা.) জান্নাতুল বাকিতে প্রিয় সাহাবাদের কবর শেষবারের মতো জিয়ারত করে এসেছিলেন, অতঃপর ভোরবেলা থেকেই তিনি অসুস্থ বোধ করতে লাগলেন। (সীরাত ইবনে হিশাম ২/৬৪২)

নামাজের জামাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ : অসুস্থতা ক্রমেই বাড়ছিল, ওফাতের দু-তিন দিন আগে একপর্যায়ে একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং বারবার বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায়ও জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা নামাজ পড়ে ফেলেছে? বলা হলো, না, তারা আপনার অপেক্ষা করছে।

রাসুল (সা.) অজু করলেন, আর অমনিতেই বেহুঁশ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা নামাজ পড়ে ফেলেছে? বলা হলো, না, তারা আপনার অপেক্ষা করছে। রাসুল (সা.) অজু করলেন, আর অমনিতেই বেহুঁশ হয়ে গেলেন। অতঃপর হুঁশ ফিরলে আবু বকর (রা.)-কে নির্দেশ পাঠালেন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে নামাজ পড়ে নেন।

উম্মতকে শেষবারের মতো ত্যাগের শিক্ষাদান : অসুস্থ অবস্থায় একবার আম্মাজান আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা! ঘরে কিছু স্বর্ণমুদ্রা ছিল না? তা কোথায়? আয়েশা (রা.) পাঁচ-সাতটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে এলেন। রাসুল (সা.) বললেন, আয়েশা! এগুলো সদকা করে দাও। এ ছাড়া তিনি তাঁর সব গোলামকে আজাদ করে দিলেন, এমনকি ঘরে রাখা অতি প্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সব জিনিসই দান করে দিলেন। (মুসনাদে আহমাদ ৬/৪৯, সহিহ ইবনে হিব্বান, ৩২১২)

সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে লক্ষ্য করে রাসুল (সা.)-এর সর্বশেষ ভাষণ : আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করার পর সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ করে কয়েকটি বিষয় আলোচনা করলেন। তন্মধ্যে তাঁর পরে হজরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের প্রতি ইঙ্গিত করলেন এবং বললেন, দুনিয়ার মধ্যে আবু বকরের চেয়ে জান-মালে আমার ওপর অধিক উপকারকারী আর কেউই নেই, তার উপকারের প্রতিদান আমি দুনিয়াতে শোধ করতে পারিনি, আল্লাহ তায়ালা আখিরাতে তার প্রতিদান দেবেন।

অতঃপর আনসার সাহাবিদের কোরবানির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁদের জন্য দোয়া করলেন এবং লোকদের তাঁদের সঙ্গে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিলেন। (বুখারি, ৯২৭; মুসলিম, ২৩৮২)

অন্তিম অসিয়ত : অসুস্থাবস্থায় সাহাবায়ে কেরামের একটি দল রাসুল (সা.)-এর ঘরে একত্র হলে তিনি সবার জন্য দোয়া করলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের অসিয়ত করছি তাকওয়া, অর্থাৎ খোদাভীতি অর্জনের জন্য। আর আল্লাহর বান্দাদের ওপর অহংকারী হয়ো না। ইহুদি-খ্রিস্টানদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ, তারা নবীগণের কবরগুলোকে সিজদাগাহ বানিয়েছে। ইহুদি-খ্রিস্টানদের ন্যায় আমার মৃত্যুর পর তোমরা আমার কবরকে সেজদাগাহ বানিয়ো না। (বুখারি, ৪৪৪৩)

সর্বশেষ কথা : মৃত্যুর কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি বলেন, ‘তোমরা নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হও। আর তোমাদের অধীনস্থদের সঙ্গে দয়া ও ন্যায়ের আচরণ করো। ‘ (আবু দাউদ, ৫১৫৬)

ইন্তেকাল : মৃত্যুর কিছু সময় পূর্বে তিনি মিসওয়াক করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মিসওয়াকরত অবস্থায় তিনি ঘামতে শুরু করেন। আর পাশে রাখা পানি দিয়ে পবিত্র মুখমণ্ডল মাসেহ করতে লাগলেন। হঠাৎ হাত থেকে মিসওয়াক পড়ে যায়। আর তখনই তিনি ‘আল্লাহুম্মার রফিকাল আ’লা’ বলে সর্বোত্তম বন্ধু প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে পরকালে পাড়ি জমান। (বুখারি, ৪৪৪৯)

লেখক : ফতোয়া সংকলন প্রকল্পের গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন